উত্তর আমেরিকায় চীনা যন্ত্রাংশ ও পণ্য প্রবেশে মধ্যস্থতাকারী বা পথ হিসেবে একাধিকবার সমালোচনায় পড়েছে মেক্সিকো। কারণ মার্কিন বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দেশটির মাধ্যমে অঞ্চলটিতে বাণিজ্য সুবিধা নিচ্ছে বেইজিং। এ নিয়ে সম্প্রতি মেক্সিকোয় উদ্বেগ বেড়েছে। এ কারণে চীনা যন্ত্রাংশের বদলে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে দেশটির সরকার। খবর এপি।
মেক্সিকোর কর্মকর্তাদের ধারণা, সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প অথবা রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকা কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো তিন দেশের বাণিজ্য চুক্তি ইউনাইটেড স্টেটস-মেক্সিকো-কানাডা এগ্রিমেন্ট (ইউএসএমসিএ) পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এতে মেক্সিকোকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করতে পারে প্রতিবেশী দেশ দুটি, যা মেক্সিকোর অর্থনীতি ও শিল্পে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন শাসক দল মোরেনা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম গত শুক্রবার জানিয়েছেন, বিভিন্ন কোম্পানিকে চীনা যন্ত্রাংশের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারিভাবে বিশেষ প্রচার চালানো হচ্ছে।
প্রচারণার সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় শেইনবাউম জানিয়েছেন, মেক্সিকান সরকারের নতুন একটি পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য চীন থেকে আমদানি হওয়া যন্ত্রাংশের পরিবর্তে একই ধরনের যন্ত্রাংশ মেক্সিকোয় উৎপাদন করা। স্থানীয় কোম্পানি বা উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক কোম্পানির মাধ্যমে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।
তিনি আরো দাবি করেন, ২০২১ সালে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন সংকট শুরু হওয়ার পর মেক্সিকো এ সমস্যার সমাধানে কাজ করে আসছে। ওই সময় বিশ্বে কারখানা যন্ত্রাংশের অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। বিশেষত এশিয়া থেকে আসা কম্পিউটার চিপের অভাব সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। কারণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে চীন বিশ্বব্যাপী যন্ত্রাংশ ও চিপ সরবরাহে প্রধান ভূমিকা পালন করে। যখন সরবরাহ চেইনের গতি থমকে যায়, তখন বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
ক্লাউডিয়া শেইনবাউম বলেন, ‘মেক্সিকো তখন থেকেই চেষ্টা করছে চীন ও এশিয়া থেকে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজ দেশে এসব যন্ত্রাংশ উৎপাদন করার। কিন্তু এটি সহজ কাজ নয়।’
ত্রিদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ মেক্সিকোয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বিদেশী গাড়ি নির্মাতারা কম মজুরির সুবিধা নিতে তাদের কারখানাগুলো মেক্সিকোয় স্থানান্তর করেছিল। তবে আশঙ্কা রয়েছে চীনা যন্ত্রাংশ অথবা সম্পূর্ণ গাড়িও এ চুক্তির সুবিধা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পকে আরো দুর্বল করতে পারে। যে কারণে উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
সম্প্রতি মেক্সিকোর অর্থমন্ত্রী মার্সেলো এব্রার্ড আশা ব্যক্ত করেন আগামী বছর মেক্সিকো নিজ দেশেই মাইক্রোচিপ তৈরির কাজ শুরু করবে। তবে ‘শুরুতেই হয়তো খুব উন্নত মানের চিপ হবে না’ বলেও জানিয়ে রাখেন তিনি। তার পরও দেশেই চিপ উৎপাদন শুরু হবে।
স্থানীয়ভাবে চিপ উৎপাদন মেক্সিকোর অনেক বড় একটি পদক্ষেপ। কারণ প্রযুক্তিগতভাবে চিপ উৎপাদন জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবু এটিকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনের আগের ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি জয়ী হলে মেক্সিকো থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করবেন।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০ লাখ গাড়ি রফতানি করেছে মেক্সিকো। এর প্রায় অর্ধেকই তৈরি করেছে জেনারেল মোটরস, ফোর্ড মোটর কোম্পানি ও স্টেলান্টিসের মতো শীর্ষ নির্মাতারা।
এছাড়া জুলাইয়ে মেক্সিকো থেকে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। উদ্দেশ্য যাতে মেক্সিকোর মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে আমদানি কর এড়াতে না পারে চীন। ওই সময় মেক্সিকোয় উৎপাদিত ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর যথাক্রমে ২৫ ও ১০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়।